মোবাইলে ইন্টারনেট ঘেঁটেই রোবট বানিয়ে ফেলল কিশোর সুজন

বিশ্বের প্রথম রোবট হিসেবে নাগরিকত্ব পেয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করা ‘সোফিয়াকে’ টেলিভিশনে দেখে অ'ভিভূ'ত হয়েছিল কিশোর সুজন পাল। এরপর রোবট বানানোর স্বপ্ন বাসা বাঁধে তার মনে। তখন বয়স মাত্র ১৩ বছর, ৮ম শ্রেণির ছাত্র। স্বপ্নবাজ এই মেধাবী কিশোরের স্বপ্নপূরণে ছিল হাজারও বাধা। তথ্যপ্রযুক্তিতে বিশ্বকে নেতৃত্ব দেয়া সিলিকন ভ্যালির মতো সুযোগ-সুবিধা নেই সুজন পালের জন্মস্থান বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজে'লার প্রত্যন্ত গ্রামে। বছর পাঁচেক আগেও সেখানে বিদ্যুৎ সংযোগ ছিল না।

রোবট তৈরির জন্য আধুনিক গবেষণাগার, যন্ত্রাংশ ও অ'ভিজ্ঞতা অর্জনেরও কোনো সুযোগ ছিল না তার। রোবট নিয়ে আগ্রহ থাকলেও এ বি'ষয়ে সামান্য জ্ঞান ছিল না তার। আরও একটি বড় বাধা ছিল অর্থের জোগান। সুজন পালের বাবা জয়দেব চন্দ্র পেশায় কুমোর। মাটির হাঁড়ি-পাতিল, কলসি ইত্যাদি নানা তৈজসপত্র তৈরি করে বাজারে বিক্রি করেন তিনি। সেই উপার্জনে কোনোরকম চলে সংসার। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে সুজন সবার ছোট।এ অবস্থায় দরিদ্র পরিবারের সুজনের রোবট তৈরির বি'ষয়টি ছিল অনেকটা দিবাস্বপ্নের মতো। তবে অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর আ'ত্মবিশ্বা'সের জোরে স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিয়েছে সে। বাড়িতে বসেই তৈরি সুজনের মানবসদৃশ রোবট ‘ব'ঙ্গ’ এখন বাস্তব। এটি আশপাশে আগু'ন লাগলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিকটস্থ ফা’য়ার সার্ভিস অফিসে এসএমএস পাঠিয়ে জানিয়ে দিতে পারে, বাড়িতে গ্যাস লাইন বা সিলিন্ডার লিকেজ হলে অ্যালার্ম দিয়ে সতর্ক করতে পারে, করো’নাভাইরাস প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে জানাতে পারে এবং ভালো ফলন পেতে কৃষকদের নানা তথ্য দিতে সক্ষম সে। এছাড়াও রোবটটি শিশুদের প্রাথমিক স্তরের পড়াশোনা শেখাতেও সক্ষম।

কেউ আঘা'ত পেলে, কে'টে গেলে, জ'খম হলে, পানিতে ডুবে অসুস্থ হলে, আগু'নে পুড়ে গেলে প্রাথমিক চিকিৎসার বি'ষয় জানিয়ে দিতে পারে ব'ঙ্গ। তার কাছে রয়েছে হাজারও প্রশ্নের সঠিক উত্তর। বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি ও বরিশালের আঞ্চলিক ভাষায় বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে সুজনের রোবটটি। কোথাও আট'কে গেলে গু'গল-উইকিপিডিয়া ঘেঁটে অনায়াসে উত্তর দিতে পারে সে। সুজন পাল (১৭) বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজে'লার গৈলা ইউনিয়নের শিহিপাশা গ্রামের জয়দেব চন্দ্র পাল ও সবিতা রানী পাল দম্পতির সন্তান। ২০২০ সালে আগৈলঝাড়া সরকারী গৈলা মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করে ভর্তি হয় সরকারি গৌরনদী কলেজের একাদশ শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগে। সুজন পাল জাগো নিউজকে জানায়, ‘যখন ৮ম শ্রেণিতে পড়ি তখন টেলিভিশনে সোফিয়াকে দেখে রোবট বানানোর স্বপ্ন দেখতে শুরু করি। তবে পরিচিত এমন কেউ ছিল না, যে তার মাধ্যমে রোবটিকস বি'ষয়ে ধারণা নিতে পারি। তখন ইন্টারনেট নির্ভর প্রযুক্তি ব্যবহার ছিল আমা'র কাছে ছিল অসাধ্য ব্যাপার। একটি কম্পিউটার কেনার শখ ছিল। কিন্তু আমা'দের পরিবারে তা ছিল বিলাসিতা।

তাই কম্পিউটার কেনার চিন্তা বাদ দিয়ে একটি স্মা'র্টফোন কেনার কথা ভাবতে থাকি। কিন্তু তার জন্যও অর্থের প্রয়োজন। বাবা-মায়ের কাছে স্মা'র্টফোন কিনে দেয়ার বায়না ধরি। অবশেষে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে বাবা একটি স্মা'র্টফোন কিনে দেন। ফোনটি আমাকে স্বপ্নপূরণের অনেক কাছাকাছি নিয়ে যায়।’ সুজন আরও বলে, ‘করো’নার মধ্যে কলেজ বন্ধ। তাই সারাদিন ইন্টারনেট ঘেঁটে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং সম্পর্কিত নানারকম লেখা পড়তে শুরু করি। রোবোটিকস বি'ষয়ে নানা ভিডিও দেখি। তবে রোবট নিয়ে কাজ করা আমা'র জন্য সহজ ছিল না। কারণ রোবট তৈরিতে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ এই উপজে'লা শহরে নেই। বরিশালে গিয়ে খুঁজতে থাকি। কিছু যন্ত্রাংশ পাওয়া গেলেও বেশিরভাগ সেখানেও নেই। এরপর অনলাইনে যন্ত্রাংশ খুঁজতে থাকি। দারাজ ও আলিবাবা ডটকমে যন্ত্রাংশ বিক্রির বি'ষয়টি চোখে পড়ে। তবে সেখান থেকে যন্ত্রাংশ কিনতে অনেক অর্থের প্রয়োজন। এই অর্থ যোগাড়ে শুরু করি টিউশনি। তবে টিউশনির অর্থও ছিল অ’প্রতুল।

এরপর বাবা-মা ও বড় ভাইয়ের কাছে নানা কথা বলে টাকা নিতাম।’ সুজন জানায়, ‘চার মাস আগে রোবট তৈরি করতে হাতে-কলমে কাজ শুরু করি। ঝালাই করা (শোল্ডারিং) শিখেছি স্থানীয় দোকানের মেকানিকের কাছ থেকে। প্রথম'দিকে বাসার কেউ জানত না। রোবট বানানোর বিভিন্ন যন্ত্রপাতি লুকিয়ে রাখতাম। যখন বাবা বাইরে যেত আর মা রান্নাঘরে ব্যস্ত থাকত, তখন আমি আমা'র কাজ শুরু করে দিতাম। সবাই ঘু'মিয়ে পড়লে কাজ করতাম। রাত ২টা-৩টা পর্যন্ত কাজ করতাম। একদিন বাবা-মা টের পেয়ে গেলেন। গালমন্দ করলেন। তবে পিছু হটিনি। দীর্ঘ চার মাসের চেষ্টায় বাড়িতে বসেই বানিয়ে ফেলি রোবট ব'ঙ্গকে। যেদিন বানাতে সফল হয়েছিলাম, সেদিনই মা-বাবাকে দেখিয়েছিলাম। রোবটটিকে কথা বলতে দেখে তারা বিস্মিত হয়েছিলেন। এরপর বি'ষয়টি জানাজানি হলে বাড়িতে লোকজনের ভিড় বাড়তে থাকে। মানুষ বাবা-মায়ের সামনে আমা'র প্রশংসা করে। এখন বাবা-মা এ কাজে উৎসাহ দিচ্ছেন।’ উল্লিখিত কাজগু'লো ছাড়াও সুজনের রোবটটি বেশ বিনয়ীও। কেউ করমর'্দন করতে চাইলে সে স্বয়ংক্রিয়ভাবে হাত বাড়িয়ে দেয়।

ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গু'গলের বিশাল তথ্যভাণ্ডারে যুক্ত থাকে সে।ব'ঙ্গ-এর মূল কাঠামো তৈরি করা হয়েছে পিভিসি বোর্ড ব্যবহার করে। চার ফুট চার ইঞ্চি উচ্চতার রোবটটির দুটি অংশ। কোমর' থেকে পা পর্যন্ত অংশটুকু বাদে ওপরের অংশটুকু মূল কাজে ব্যবহার করা হয়। প্রায় ২০ কেজি ওজনের রোবটটিতে ব্যবহার করা হয়েছে আরডুইনো বোর্ড। পাঁচ ধরনের সেন্সর ছাড়াও হাত ও ঠোঁট নাড়াচাড়া করতে এতে ব্যবহার করা হয়েছে ছোট আকৃতির পাঁচটি মোটর। তাছাড়া ব'ঙ্গ-এর শরীরে আছে অসংখ্য যন্ত্রপাতি। এটি তৈরিতে খরচ হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার টাকা। সুজনের জন্য রোবটের যন্ত্রাংশ কেনা অনেক ব্যয়বহুল ব্যাপার। তবে সরকারি-বেসরকারিভাবে আর্থিক সহায়তা পেলে তার রোবটটিকে আরও উন্নত করা সম্ভব। যা মানুষের সাহায্য করতে পারবে বিভিন্নভাবে। যেখানে মানুষের জীবনের ঝুঁকি রয়েছে, এমন জায়গায় এই রোবটকে কাজ করানো সম্ভব। যেমন দুর্গম জায়গা থেকে কোনো কিছু উ'দ্ধার করতে ব্যবহার করা যাব'ে রোবটটিকে।

এছাড়া, ভারি বস্তু উত্তোলন এবং শিল্পকারখানায় নানা কাজে ব্যবহার করা যাব'ে ব'ঙ্গকে। আবহাওয়া ও ভূমিকম্পের পূর্বাভাস জানাতে পারবে তার রোবট। সুজনের এখন স্বপ্ন রোবটিকস বি'ষয় নিয়ে উচ্চশিক্ষা নেয়া। সে মনে করে, শিক্ষা, প্র'শিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা পেলে ছোট এই রোবট থেকে হয়তো একদিন আরও বড় কিছু তৈরি করছে পারবে। তার বাবা জয়দেব চন্দ্র পাল বলেন, ‘আমা'দের ছেলে এই বয়সে রোবট বানাবে কল্পনাতেও ছিল না। গত কয়েকমাস সারা দিন ঘরের মধ্যে যন্ত্রপাতি নিয়ে সময় কাটিয়েছে। ওর মা ও আমি এজন্য অনেক বকাঝকা করেছি। একদিন আমা'দের ডেকে দেখায় পুতুলের মতো একটি মেশিন তার স'ঙ্গে কথা বলছে।

এখন প্রতিদিনই সুজনের রোবট দেখতে দূরদূরান্ত থেকে লোকজন বাড়িতে ভিড় করে। ইউএনও স্যারও সুজনের খোঁজ নিয়েছেন। সহযোগিতার আশ্বা'স দিয়েছেন। এখন সুজনের জন্য আমা'দের গর্ব হয়।’ এ বি'ষয়ে আগৈলঝাড়ার উপজে'লা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. আবুল হাশেম বলেন, ‘আগৈলঝাড়া উপজে'লার শিহিপাশা গ্রামের সুজন পাল কিশোর বয়সে রোবট বানিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। কারও সাহায্য ছাড়াই এত বড় অর্জন বিশাল ব্যাপার। পরিশ্রম করলে তার মূল্য যে কেউ পেতে পারে তার অনন্য দৃষ্টান্ত সে।

’তিনি আশা করেন, এই রোবট তৈরির বি'ষয়টি জেনে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞানচর্চায় আরও বেশি আগ্রহী হবে। ইউএনও আরও বলেন, ‘সরকারি আর্থিক সহায়তা পেতে সুজনকে আবেদন করতে বলা হয়েছে। সহায়তা প্রা'প্ত ির জন্য আবেদনটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। জে'লা প্রশাসক কয়েকবার সুজনের খোঁজ নিয়েছেন। তিনি সুজনের বি'ষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার গ্রহণের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। আশা করছি অর্থের জন্য সুজনের উদ্ভাবনী কাজ থেমে যাব'ে না।’

About admin

Check Also

খেলতে যাই

খেলতে যাই

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *